Sunday, March 31, 2019

অলাদা, লঙ্কাদা এবং রামপ্রসাদ

জানুয়ারি মাস, ১৯৯২। মফস্বলের রাস্তা, বি টি রোড থেকে ঢুকে গেছে, গঙ্গার দিকে। রাস্তার ওপরে হাসপাতাল, ডাকঘর। ঢাকা নর্দমার ওপরে একটা পরিচ্ছন্ন দোকান। চুল কাটার দোকান। রামপ্রসাদ কাকু চুল কাটছে। শৌখিন টিপটপ সাদা জামা, ব্যাকব্রাশ করা জেট ব্ল্যাক চুল। পাতলা গোঁফের কোণ দুটো বেশ তরিবৎ করে পাকিয়ে পাকিয়ে বেঁকানো হয়েছে। রোগা শত্রুঘ্ন সিনহার মত দেখতে।

একটা বিশাল কাঠের চেয়ারে আমি বসে আছি। স্মৃতি বিশালত্ব আরোপ করেছে ঠিকই, কিন্তু আবার ভেবে দেখলাম সত্যিই চেয়ারটা বিশাল। কাঠের চেয়ারের হ্যান্ডেল দুটোর ওপরে মাঝামাঝি জায়গায় একটা কাঠের তক্তা পাতা আছে, বাচ্চাদের জন্য - সেখানে আসীন আট বছরের আমি। রামপ্রসাদ কাকুর একটা কালো রেডিও, চকচকে, রোদ পেছলায়। তাতে ইন্ডিয়া অস্ট্রেলিয়া টেস্টের কমেন্ট্রী হচ্ছে। আশেপাশের দোকানের সবাই, পথচলতি মানুষ সব্বাই শুনছে। হাত চলছে, গল্প হচ্ছে আর ক্রিকেট শোনা হচ্ছে। আমাদের ভোরবেলা থেকে অস্ট্রেলিয়ায় খেলা শুরু হয়েছে। অখণ্ড মনোযোগ দিয়ে আমি আমার সীমিত হিন্দিজ্ঞান উপচে নিয়ে খেলার হালহকিকত বোঝার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

বাবা বাজারে যাওয়ার আগে রামপ্রসাদ কাকুর কাছে জিম্মা করে দিয়ে গেছে। খুব পরিষ্কার নির্দেশ, চুল কাটার পরে যেন দু আঙ্গুল দিয়ে চুল টেনে ধরা না যায়, তাহলেই রামপ্রসাদ কাকু ফেল। 
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে হিন্দি এবং বাংলা সিনেমার হিরোরা ঢেউ খেলা লম্বা চুল রাখতেন। মানে তাঁদের মধ্যে একটা নতুন কিছু করে দেখানোর তাগিদ ছিল। তাই হিরোইন ঘপাঘপ চুল কেটে ফেলতেন, বোধহয় ববকাট বলত। আর পুরুষ অভিনেতারা ঘোড়া-মার্কা ঢেউ ঢেউ চুল রাখতেন। তবে ঘোড়ার মত জোরে দৌড়তে পারতেন না বলে স্ট্যান্ড ফ্যান দিয়ে তাঁদের চুল ও অভিনেত্রীর স্কার্ট ওড়াতে হত। এর একটা সুদূরপ্রসারী প্রভাব মফস্বলের স্কুলেও আছড়ে পড়েছিল। রামকৃষ্ণ মিশনে আমাদের চুল কাটার ব্যাপারে কড়া নির্দেশ জারি করা হয়েছিল। ছাত্রের বাড়িতে রিপোর্ট যেত, তাতে কাজ না হলে গার্ডিয়ান কল হত। 
আঃ দেখেছেন গার্ডিয়ান বলে ফেললুম, আজকে আমরা শুধু নব্বইয়ের মফস্বলী ভাষায় কথা বলব। শুধু গার্জিয়ান কল নিয়ে এক পাতা লিখে ফেলা যায়। আজকে শুধু বলে রাখা যাক, শান্ত মফস্বলের স্কুল জীবনে গার্জিয়ান কল এক আতঙ্কের অধ্যায়।

বাবা বাজার থেকে ফিরলে আমায় নিয়ে ডক্টরস কোয়ার্টারে যাবে, তারপর আমি স্কুল। বাবা যাবে হাসপাতাল। ভাই মার সাথে বাড়িতে। স্কুল থেকে ফিরলে আমি আবার মার সাথে হাসপাতালে। স্কুলে নতুন ক্লাসে উঠলে, প্রথম দিন রোল কলের সময় মাষ্টারমশাই জিজ্ঞেস করেন, কে কোথা থেকে এসেছে? তোমার বাড়ি কোথায়? আমি উত্তর দিতাম - বলরাম সেবাকেন্দ্র হাসপাতাল। সারা ক্লাস হাসিতে ভেঙ্গে পড়ত, হাসপাতালে কেউ থাকে নাকি রে বোকা? জ্বর-জারি হলে যায়। কিন্তু আমি তো ছোট। বাবা মা তো কোয়ার্টারে রেখে যেতে পারেন না, সাথে নিয়ে নিয়ে ইভনিং ডিউটি, মর্নিং বা নাইট শিফট করেন।

ওদিকে রেডিওতে শোরগোল শুরু হয়েছে। রবি শাস্ত্রী বলে কেউ একটা ডাবল সেঞ্চুরি করেছে। ডাবল সেঞ্চুরি শব্দবন্ধের অর্থ তদ্দিনে জানা হয়ে গেছে। ১৯৯২ ওয়ার্ল্ড কাপ সামনে। নিজেকে প্রতিনিয়ত আপডেটেড রাখতে হচ্ছে বৈকি। রাম প্রসাদ কাকুর পরের দোকানটাই লঙ্কাদার। লঙ্কাদার বয়েস রামপ্রসাদ কাকুর থেকে বেশী হতে পারে, অন্তত তাই দেখায়। কিন্তু কোন অজানা কারণে উনি সবার দাদা। আমার দাদা, আমার বাবার দাদা, আমার ভাই যখন কথা বলতে শিখবে তারও দাদা হবেন। অদ্ভুত ব্যাপার। কাউকে কোনদিন বলতে শুনি নি লঙ্কাকাকু বা লঙ্কা জেঠু বা শুধু লঙ্কা। ফর্সা ছয় ফুটিয়া রোগা চেহারা। কবজি দড়ি পাকানো। দুহাতে নীল শিরা ফুলে আছে, ফরসা ব্যাকগ্রাউন্ডের ওপরে। ভারী ফ্রেমের চশমা আর ঝাঁটা ঝাঁটা গোঁফ। হাতের তালু দুটো নোংরা, বিচ্ছিরি রকম নোংরা। সারা দিন ধরে সাইকেল ঘাঁটছে তো। ওই তো একটা সাইকেল লিক এসেছে। আমি কাঠের চেয়ারের আসন থেকে শ্যেন দৃষ্টিতে লক্ষ রাখছি। আমার বর্তমান সাইকেল নাকি দু চাকার, আমি সবাইকে তাই বলি। আসলে বাঁপাশে একটা তিন নম্বর চাকা হেলান দিয়ে লাগানো। মানে ওই দিকে সাইকেল হেলে গেলে মাটিতে পা না পেলেও সাইকেল থেকে পড়ব না। ধুস্‌, কবে যে লম্বা হব?
দু চাকার সাইকেল চালানো একটা অন্য স্কিল, কবে যে পারব? আরও অ-নে -ক লম্বা হতে হবে। আঠাশ ইঞ্চির ডার্ক গ্রিন হারকিউলিস সাইকেল চালাতে না পারলে জীবন বৃথা। রাস্তায় একটা পা পিচের ওপরে থাকবে, আর একটা পা সাইকেলের প্যাডেলে। কেউ যেন বুঝতে না পারে যে মাটিতে পা ঠেকাতে কি কষ্ট হচ্ছে। ব্যালে ড্যান্সারের স্কিলে গোড়ালি থেকে পায়ের পাতা নব্বই ডিগ্রীতে বেঁকিয়ে মাটিতে ঠেকিয়ে রাখতে হবে।

ওখানেই শেষ নয়, তারপর ডাবল ক্যারি করা শিখতে হবে। শেষ স্টেপ হাত ছেড়ে চালানো - দু হাত ছেড়ে। আর এইসব সব স্কিল যারা সহজেই দেখাতে পারে, তারা এসে লঙ্কাদাকে কাকুতি মিনতি করে - আমার সাইকেল টা একটু দেখে দাও না লঙ্কাদা। 
স্পিড উঠছে না, পাশের পাড়ার একটা ছেলে কি একটা রং বেরঙের সাইকেল কিনেছে। সেদিন রেসে হেরে গেলাম।
লঙ্কাদা গজ গজ করছে, শোন হারিকিউলিসকে কেউ হারাতে পারে না। তুই চালাতে পারিস না, তাই হেরে গেছিস। কোথায় রেস হচ্ছিল?
ঘোষপাড়ার মাঠ চক্কর দিয়ে। বড় রাস্তায় রেস করতে বারণ করেছে তাই।
হুম, ছেলেটা নিশ্চয়ই তোকে মাঠের কোণা দিয়ে মোড় ঘোড়ার সময় বিট করেছে? হ্যাঁ, জানলে কি করে?
জানলাম আর কি করে। তোর বাবারও এই এক প্রবলেম ছিল। শোন মোড় যখন ঘুরবি, বেড়টা একটু বড় করে নিবি। এক দু মিটার বেশী যেতে হবে, কিন্তু স্পীড নামাতে হবে না।

রামপ্রসাদ কাকুর কাঁচির ঝনঝনানি ছাপিয়ে আমার কানে শুধু এই বুদ্ধি ঢুকছে। উফ্‌ একবার সাইকেল চালাতে শিখি। তারপর লঙ্কাদাকে তাক লাগিয়ে দেব। 
আর একজন এসেছে। সাইকেল লিক। এটা খুবই সাধারণ ব্যাপার। হাসপাতালে জ্বর পেটখারাপ সর্দি কাশির মত। লঙ্কাদা সাইকেলের টায়ার খুলে তার ভেতর থেকে টিউবটা বার করল। তারপর হাওয়া ভরে জলে ধরে ধরে লিক খুঁজে বার করল। তারও পরে একটা কালো চওড়া ফিতে থেকে চৌকো একটা অংশ কেটে নিয়ে সেটা কে ভালো করে জলে ঢুয়ে শুকনো কাপড় দিয়ে পরিষ্কার করল। একটুও ধুলো যেন লেগে না থাকে, তাহলে আঠা ধরবে না। এরপরে স্টেপটা শৈল্পিক - ওই চৌকোখণ্ডটার প্রতিটি কোণা কেটে কেটে গোল করা হল। আজকের আমি জানি ওটাকে বলে রাউন্ডেড রেক্ট্যাঙ্গল - কেন করা হল? আঠা দিয়ে লাগানোর পরে  কোণা কোণা হয়ে থাকলে সাইকেল চালানোর সময় সহজেই কোণাগুলো ঘষা খেয়ে উঠে আসতে পারে। সেটাকে আটকানো হল।

লঙ্কাদা আর রামপ্রসাদ কাকুর উল্টোদিকে রাস্তা পেরিয়ে অলাদার দোকান। হাসপাতালে গা ঘেঁষে পাকা দোতলা বাড়ি - দেখলেই বোঝা যায় শক্তপোক্ত বাড়ি। মধ্যবিত্ত বাহারি বাড়ি নয়। একতলায় দোকান, দোতলায় ঘর। সিমেন্টের দোকান। ছোটবেলায় আমার খুব ইচ্ছে ছিল জিজ্ঞেস করার উনি কোন দোকানের সিমেন্ট দিয়ে বাড়ি বানিয়েছেন? বাড়ি বানানোর আগে তো ওঁর কাছে দোকান ছিল না,  সিমেন্ট'ও ছিল না, তাই না? 
অলাদা রাশভারী পয়সাওলা মানুষ। সকালে রামপ্রসাদ আর লঙ্কাদার দোকানের দিকে মুখ করে খবরের কাগজ পড়ছেন। মুখ দেখা যাচ্ছে না। দেখা গেলে কন্ট্রাস্ট শব্দের সংজ্ঞা জানা যেত। ধবধবে সাদা পাজামা পাঞ্জাবি আর নিকষ কালো মুখমণ্ডল। প্রথম প্রজন্ম ধনী হয়েছে সেটা বোঝা যেত। সকালে লুঙ্গি পরে অলাদা নিজের সিমেন্টের দোকান নিজেই ঝাঁট দিয়ে সাফ করতেন। পরের প্রজন্মকে বিশেষ হাত লাগাতে দেখা যেত না।

...

আজকে এই অব্দি থাক। 

ফ্ল্যাট বাড়ি উঠে গেছে আজ বারো বছর হয়ে গেল। রামপ্রসাদ কাকু বিষয়ী মানুষ - তাই ফ্ল্যাট বাড়ির পেছনের দিকে একটা দোকান বাগাতে পারেছে। কিন্তু লোকে আজকাল শুধু কাঁচির কারিকুরিতে আকৃষ্ট হচ্ছে না, রেডিও তে টেস্ট নয়, মোবাইলে আই পি এল টাই এখন চল। রামপ্রসাদ কাকু হাঁটছে, জোরে দৌড়চ্ছে এই সময়টাকে ধরবার জন্য।

অলাদা সিমেন্টের দোকানে ঝাঁট দিয়ে জড়ো করা প্লাস্টিকে আগুন জ্বালাতে গিয়ে লুঙ্গিতে আগুণ ধরিয়ে ফেলেন। বলরাম সেবা মন্দিরে যখন নিয়ে যাওয়া হয়। কুচকুচে কালো মানুষ তো, তাই দেখে বোঝা যাচ্ছিল না, হাসপাতালে টের পাওয়া গেল ৭০% বার্ন হয়ে গেছে। ডিউটীতে মা, বড় হাসপাতালে রেফার করা হয়, কিন্তু বাঁচানো যায় নি। অলাদার ছেলে সিমেন্টের দোকানের জায়গায় ওষুধের দোকান দিয়েছে, হাসপাতালের পাশে চলবে ভাল।

লঙ্কাদা তাঁর দোকানের পরিবর্তে কিছু জোগাড় করে উঠতে পারেন নি। অবিবাহিত মানুষ, ভাইপোরা এক বেলা ভাত ডাল খেতে দিত। আর লঙ্কাদা শেষের দিকটা বাড়ি বসেই সাইকেল সারাত। লঙ্কাদা সময়কে ধরার চেষ্টা করে নি। গিয়ার ওলা সাইকেল দেখলে না করে দিত। হারকিউলিস হচ্ছে রাজা সাইকেল। সেসব ছেড়ে এই রং বেরঙের খেলায় লঙ্কাদা নামতে পারেনি। শেষের দিকে প্রায় অভুক্ত অবস্থায় মৃত্যু।

আমার সময় আরও দ্রুত ফুরিয়ে আসার আগে, রামপ্রসাদ কাকুর দোকানে ওই দু আঙ্গুলে ধরা যায় না, সেই রকম করে চুলটা কেটে আসতে হবে। 

সময়টাই বা আঙ্গুলে ধরতে পারছি কই? 

No comments:

Post a Comment