Thursday, January 30, 2014

আপনি বোধহয় তখন ...

সময়ঃ রাত সাড়ে আট'টা (আই এস টি)
স্থানঃ কলকাতা শহরের (নিউ টাউন) একটি পেট্রল পাম্প
পাত্রঃ অধম আমি (সাহেব'দের মত করে বললে ইয়োরস্‌ ট্রুলি)

- ভাই, ফুল ট্যাঙ্ক।
- পেট্রল না ডিজেল?
- ডিজেল।
- (সামনে আঙ্গুল দেখিযে) ওইটায় লাগান।
চোখের কোণা দিয়ে দেখলাম, তেল ভরার লম্বা পাইপ'টা ছেলেটি অনিচ্ছাভরে গাড়ির পেছন'দিকে বয়ে নিয়ে গেল। এক হাতে তেলের পাইপ'টা ধরে আছে, আর এক হাতে গাড়ির ট্যাঙ্কের মুখ'টা খুলছে। সিক্সথ্‌ সেন্স বলছে যে কোনো মুহূর্তে পাইপটা ডিকির ওপরে ল্যান্ড করবে। আর একজনকে ডাকা উচিত, নিদেন পক্ষে আমায় বললেই পারে। সিট ছেড়ে নামতে নামতেই দুড়ুম। এরকম আওয়াজ কলকাতার রাস্তাঘাটে প্রায়'ই শোনা যায়, কিন্তু নিজের গাড়ি বলেই - কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল গো এবং আকুল করিল মোর প্রাণ।

ফুল ট্যাঙ্ক হয়ে গেছে।
- স্যার, ষোলোশো তিরিশ।
- ভাইটি ডিকির ওপর এই যে দাগ'টা ফেললে, সেটা ঠিক করতে মারুতি দু'হাজার টাকা নেবে। তার মানে আমি আরো তিনশো সত্তর টাকা পাই। সেটা কি তুমি'ই দেবে?
- না মানে ... ওটা তো ...
- তুমি না দিতে পারলে তোমার সুপারভাইজার'কে ডাকো।
- না, মানে স্যার উনি তো এখানে নেই।
- ঠিক হ্যায়, আমি সিনেমা দেখে সাড়ে এগারোটায় ফিরবো। তখন যেন তিনি থাকেন।
- স্যার আমাদের পাম্প সাড়ে দশটায় বন্ধ হয়ে যায়। তারপর তো কেউ থাকে না।
- ওকে। তাহলে আমায় একটা কাগজ আর পেন দাও।
অফিস থেকে নিয়ে এসে, "এই যে স্যার"।
- এই যে আমার নাম, ঠিকানা, মোবাইল নাম্বার। তোমার মালিক'কে বলবে এই নাম্বারে ফোন করে শনিবার তিনশো সত্তর টাকা নিয়ে আমার বাড়ি চলে আসতে।
- কিন্তু স্যার, তেলের টাকাটা?
- এখন তো আর কথা বলা যাবে না, সিনেমা শুরু হয়ে যাবে।




অতঃপর অ্যাক্সিস মল ও চাঁদের পাহাড়।

কাট্‌ টু রাত সাড়ে এগারোটা। স্থান ও পাত্র সেম।
একটা সুমো গাড়ি, মাফলার জড়ানো এক ভদ্রমহিলা, সাথে ড্রাইভার।
পাম্পে ঢোকার আগে খুব ভালো করে ড্রাইভারের চেহারা দেখে নিলাম। নাঃ, রিটায়ার্ড মস্তান মনে হচ্ছে না। অতএব, চালাও পানসি।

ভদ্রমহিলাঃ নমস্কার, আমি'ই ওঁদের দেখাশোনা করি। আমার ড্রাইভার একটু আপনার গাড়ি'র দাগ'টা দেখবে।
- দেখুক।
ড্রাইভারঃ স্যার, আমার কাছে একটা সল্যুশন আছে, এটা উঠে যাবে।
- আচ্ছ, চেষ্টা করে দেখুন।
মিনিট পাঁচেক ঘষাঘষির পরে দাগ বেশ খানিক'টা হাল্কা হল।
- এই দেখুন, স্যার?
- কই, তাও তো দেখা যাচ্ছে।
- ওটুকু তো স্যার যাবেই। কলকাতার রাস্তায় ওরকম কত দাগ পড়ে।
- হুম্‌ ... কিন্তু এতে তো আমার চলবে না দাদা। (ভদ্রমহিলার দিকে ফিরে) না দিদি, আপনি কালকে মারুতি থেকে আমার গাড়ি সারিয়ে দিন।
ভদ্রমহিলা: দেখুন, ছেলেটি গরীব। আপনি তেলের দাম না দিলে ওর মাইনে থেকে কাটা যাবে। ওরা এমনিতেই খুব কম মাইনে পায়।
- উঁহু আপনি ভুল করছেন দিদি। আমি ওই ছেলেটির থেকে কাটতে যাব কেন? আমি তো পেট্রল পাম্পের মালিকের থেকে কাটছি। ওদের মাইনে থেকে কাটছেন তো আপনি। সে আপনি কাটবেন কিনা আপনি'ই ভেবে দেখুন। তার মধ্যে আমি নেই।

ভদ্রমহিলা (কিঞ্চিৎ বিব্রত মুখে), না ... মানে আমি ওদের দেখাশোনা করি, কিন্তু আমি ঠিক মালিক নই। আমি ফোন লাগিয়ে দিচ্ছি, আপনি প্লিজ একটু মালিকের সাথে কথা বলে নিন। 

রাত বারোটার পেট্রল পাম্পের মালিক?! আমি মুখ খোলার আগেই স্পিড ডায়ালের বোতামে চাপ পড়ল।

রাত পৌনে বারোটা। নিউ টাউনের শিয়ালগুলো সবে গাঝাড়া দিয়ে রাস্তায় বেরিয়েছে। এখন আমার হাল্কা শিভাস মেরে ঘুমোতে যাওয়ার কথা। তা না, এই মিশমিশে কালো অন্ধকারে পেট্রল পাম্পের মালিকের সাথে বিশ্রাম্ভালাপ। হুমম্‌, একটা চারমিনার হলে ভালো হত। 
মগনলালদের ট্যাক্‌ল করতে ওসব লাগে।

- (ওদিক থেকে) নমস্কার, আমি প্রদীপ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বলছি।
- (আমি, পেট্রল-পাম্প-মালিকের রেডিও-সংবাদ-পাঠক-সুলভ ইন্ট্রো'তে চমকে গিয়ে) নমস্কার, আমি অনির্বাণ দত্ত চৌধুরী বলছি।
- নমস্কার অনির্বাণ'বাবু। আমি সমস্ত ঘটনা শুনলাম। আমি অত্যন্ত লজ্জিত। আপনার গাড়ির ক্ষতি হওয়ায় আমি এবং আমার পরিবারের সবাই সর্বান্তকরণে দুঃখ প্রকাশ করছি।
- (মদনলাল মেঘরাজের পরিবর্তে জটায়ু'লাভের আনন্দ কোনোরকমে সামলে নিয়ে) দেখুন, ক্ষতি'টা তো আমার'ই হল। মানে আমার গাড়ির হল।
- হ্যাঁ নিশ্চয়ই, ঠিক'ই ঠিক'ই। আমি খুব'ই লজ্জিত। কি গাড়ি আপনার? অনির্বাণ'বাবু?
- ডিজেল গাড়ি।
- না আমি জানতে চাইছিলাম, কি মেক?
- মারুতি ... কিন্তু ...
- মডেল?
- (হাল ছেড়ে দিয়ে) ডিজায়ার।
- বাঃ ভালো গাড়ি, চড়ে আরাম আছে।

- কি মুশকিল ... কি মডেলের গাড়ি সেটা ম্যাটার করে কি? যেটা ম্যাটার করে সেটা হল, গাড়ি'টা আমার এবং আপনার পাম্পের লোকজন সেটার ক্ষতি করেছে। আপনি হয়তো ভাবছেন একটা মারুতি গাড়িতে দাগ পড়েছে, এ আর এমন কি। কিন্তু বিশ্বাস করুন যেহেতু আমায় যথেষ্ট কষ্ট করে রোজগার করে গাড়ি কিনতে হয়েছে ... (জটায়ু'র গোলগাল মুখ'টা এবার ধীরে ধীরে মগনলালের মুখে মিশে যাচ্ছে) ... আপনাকে অবশ্য পরিশ্রমের ব্যাপারটা বোঝানো একটু মুশকিল। আপনি একটা পেট্রল পাম্পের মালিক, আমি সাধারণ চাকুরে ... (বাঙ্গালী অবশেষে জ্যোতি বসুর হাত থুড়ি পা ধরে পুঁজিবাদীর এগেন্স্‌টে কমফোর্ট জোনে ঢুকে পড়েছে) ... মোদ্দা কথা আমার গাড়িটা আমার বড্ডো প্রিয়।

- নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই। পরিশ্রমের মূল্য আমি জানি অনির্বাণ বাবু। আমি পেট্রল পাম্পের মালিক বলে ভাববেন না ...... আমি পরিশ্রমের দাম জানি না। 
একদিন (একটু পজ্‌ দিয়ে) আমাকেও যথেষ্ট পরিশ্রম করে (আর একটু পজ্‌ দিয়ে) ভারতবর্ষের সেরা ফুটবলার হতে হয়েছিল।

- (এ তো জটায়ু জটায়ু নয়, ফেলুদা নিশ্চয়ই) ... ফুটবলার? ... আপনি ফুটবলার? ... নামটা কি বললেন যেন? .. (পেট্রল পাম্পের মালিকের নাম আবার কে মনে রাখে? ছিপিয়েম শিখিয়েছে মালিক মানে বুর্জোয়া) ও হ্যাঁ মনে পড়েছে ... প্রদীপ ... আপনি কি পি কে ?!

- (অ-নে-ক-টা পজ্‌ দিয়ে) হ্যাঁ, আমি'ই পি কে। আমি ফুটবলার পি কে ব্যানার্জী।

- আপনি পি কে! আপনার ভোকাল টনিক তো বিখ্যাত।
- হ্যাঁ খবরের কাগজের লোকের তাই বলে বটে। ফুটবল খেলার মত ওটাও একটা কাজ।  আচ্ছা, আপনি কি কাজ করেন?
- আমি টি সি এস ইনোভেশন ল্যাবে কাজ করি।
- আচ্ছা, ঠিক কি ধরণের কাজ?
- আর এন্ড ডি, কনফারেন্সে পেপার পাবলিশ, পেটেন্ট ইত্যাদি। 
- কলকাতাতেই?
- কনফারেন্সে পেপার প্রেজেন্ট করতে মাঝে মাঝে কলকাতার বাইরে যেতে হয়।
- বাঃ বাঃ তাই নাকি? আচ্ছা এরকম কোথায় কোথায় গেছেন আপনি?

- সেরকম তো ঠিক থাকে না, অনেক জায়গাতেই যেতে হয়। আমি শেষ গেছি যে চারটে জায়গায় গেছি সেগুলো হল কোচি, রোম, জুরিখ, ব্যাঙ্গালোর।
- রোম। বাঃ, বাঃ। রোম খুব ভালো জায়গা। উনিশ'শো ষাট সালে আমি ফ্রান্সের এগেন্‌স্টে একটা গোল করেছিলাম। রোমে খেলা হয়েছিল। 
- ফ্রান্স? ফ্রান্সের এগেন্‌স্টে আপনি গোল করেছেন?
- ইয়েস। ইকুয়ালাইজার। ইন্ডিয়ার ক্যাপ্টেন ছিলাম। অলিম্পিক্‌সে, সামার অলিম্পিক্‌সে। উনিশ'শো ষাট ... আপনি বোধহয় তখন ...

- আজ্ঞে না। আমি তখন জন্মাই নি, আমার বাবা'র তখন পাঁচ বছর বয়েস।

- অনির্বাণ'বাবু, আমার দুই মেয়ে। পিএইচডি করেছে। আমি খুব ভাগ্যবান যে তারা কলকাতায় আমার সাথে থাকে।
- সত্যিই তাই। আজকাল তো বাইরে থাকার'ই চল।
- শুধু তাই নয়। আমার খুব যত্ন নেয়। এই যে আমি আপনার সাথে কথা বলছি, আমার বড়ো মেয়ে সমানে আমাকে চোখের ইশারায় ফোন নামিয়ে রাখতে বলছে। মাঝে মাঝে আড়চোখে ঘড়ি দেখছে। আমি অবশ্য ঘড়ি দেখতে পাচ্ছি না। প্যারালিসিস হয়ে ডান দিক'টা পড়ে যাওয়ার পর থেকে মুভমেন্ট লিমিটেড হযে গেছে। বাই দ্য ওয়ে, এখন কটা বাজে অনির্বাণ'বাবু?
- বারোটা পঁচিশ।
- ও ... আমায় আজকাল চব্বিশ ঘন্টাই নার্সের অবজার্ভেশনে থাকতে হয়। পেট্রল পাম্পে যে ভদ্রমহিলা আপনার সাথে কথা বলতে গিয়েছেন, তিনি'ই আমার নার্স। ওঁর নাম বিমলা। সবাই খাওয়ার টেবিলে বসে বিমলার জন্য অপেক্ষা করছি। আমরা রাতে নিয়ম করে একসাথে খাই। নো এক্সেপশন। বিমলা এলে আমরা ডিনার শুরু করব।
- আপনাদের খেতে দেরি হয়ে গেল।
- না না, সে কোনো ব্যাপার নয়। অনির্বাণ'বাবু, আপনার সাথে কথা বলে আমার বেশ ভাল লাগছে। আপনি কোথায় পড়াশোনা করেছেন? ইঞ্জিনীয়র যখন, নিশ্চয়ই বি ই কলেজ।
- না, যাদবপুর।
- ও, হ্যাঁ শুনেছি বটে, নতুন ইউনিভার্সিটি। তা ভালো। আর স্কুল?
- রহড়া রামকৃষ্ণ মিশন।
- সে কি। রহড়ায় তো আমি অনেকবার গেছি। স্পোর্টস অনুষ্ঠানে। প্রাইজ দিতে। বক্তৃতা'ও দিয়েছি।
- হ্যাঁ, আমি মনে হয় শুনেছি। ক্লাস ফোর বা ফাইভে।

- (গলার ব্যারিটোনত্ব হঠাৎ বেড়ে গিয়ে) .. কেমন লেগেছিল? ভোকাল টনিক? ... আজকাল অবশ্য আর কোথাও তেমন যাওয়া হয় না। প্যারালিসিস সেট ইন করার পর থেকেই ......
আমার স্ত্রী কিছুদিন আগে মারা গিয়েছেন। আমার মেয়ে আর বিমলা এই হচ্ছে এখন আমার ফ্যামিলি। আচ্ছা, আপনি কি বিবাহিত?

অনেকক্ষণ ঘড়ি দেখা হয় নি। কিন্তু কথোপকথনের এই পর্যায়ে পৌঁছে সময় দেখার ইচ্ছেটা কখন বেমালুম উবে গেছে বুঝতে পারি নি।

- হ্যাঁ আমি বিবাহিত। আমার স্ত্রী আমার সাথেই আছেন।
- তাই নাকি? দয়া করে ফোনটা ওনাকে একটু দিন। আমি একটু কথা বলতে চাই।

মোবাইল হস্তান্তরিত হল।

- নমস্কার আমি প্রদীপ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বলছি। আপনাদের গাড়ির ক্ষতি হওয়ায় আমি যারপরনাই লজ্জিত। আচ্ছা, আপনাদের ক'বছর বিয়ে ......

--

(প্রদীপ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুমতি ছাড়াই এ লেখাটি লেখা হযেছে। তবে ঘটনা সত্য, কোনোদিন দেখা হলে অনুমতি চেয়ে নেব।)

6 comments: